Dhaka ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দাদুর কাঁথা ——রাহুল রাজ

  • রাহুল রাজ
  • Update Time : ০৩:৪২:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
  • ২৮ Time View

প্রকাশের সময় 27/03/2026

রাহুল রাজ এর ছোট গল্প- দাদুর কাঁথা

বিশ্বাস বাড়ির নোনা ধরা দেওয়াল আর প্রায় রং উঠে যাওয়া ফাটলগুলো দেখে বোঝা যায়, একসময় এখানে লক্ষ্মীর বাস ছিল। কিন্তু সময় আর ভাগ্যের ফেরে এখন সবটা ম্লান। পলেস্তারা খসে পড়া বৈঠকখানাটা যেন নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকে এক হারানো অতীতে।

রিমের বাবা বিমল বাবুর কাঁধে এখন ঋণের পাহাড়, সারাদিন পাওনাদারদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন। মা সুমিত্রা দেবীর কপালে দুশ্চিন্তার স্থায়ী ভাঁজ, উনুনে হাঁড়ি চড়বে কি না, সেই চিন্তায় রাত কাটে। অভাবের এই জরাজীর্ণ সংসারে একমাত্র উজ্জ্বল স্মৃতি ছিলেন রিমের দাদু, অবিনাশ বিশ্বাস।  তিনি ছিলেন এক রহস্যময় জহুরি, শুধু পাথর নয়, মানুষের মনের গভীরে থাকা আসল সোনা চিনতে পারতেন। সবসময় বলতেন, “হাতের রেখায় ভাগ্য থাকে না রে রিম, ভাগ্য থাকে মনের চাদরে। সেই চাদরের বুনিতেই থাকবে তোর আগামী।”

দাদুর মৃত্যুর পর বাড়ির অনেক কিছুই ওলটপালট হয়ে গেল। দাদুর ঘরটা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। অপ্রয়োজনীয় ভেবে কেউ ওমুখো হতো না।

একদিন বৃষ্টির দুপুরে, রিম  কৌতুহল নিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করতে গেল। ঘরে থাকা অন্যান্য আসবাবের সঙ্গে পুরোনো আমলের সেই বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটা চুম্বুকের মতন আকর্ষণ করলো তাকে। ধুলোবালি আর মাকড়সার চালে ঘেরা আলমারিটা খুলে ফেললো রিম। আলমারিটা যেন একটা ছোটখাটো অন্ধকার গুহায় পরিণত হয়েছে। পুরোনো বই আর ন্যাপথলিনের  গন্ধে একাকার হয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধুলোর আস্তরণ সরাতে একদম ওপরের তাক থেকে একটা ভাঁজ করা ভারী কাপড়ের স্তূপ তার হাতে ঠেকল। বের করে আনতেই দেখা গেল এক বিশাল নকশি কাঁথা।

কাঁথাটা মেঝেতে বিছিয়ে রিম অবাক হয়ে গেল। সাধারণত কাঁথা লম্বাটে হয়, কিন্তু এটি নিখুঁত ৯ ফিট বাই ৯ ফিট একটি বর্গাকার কাঁথা। এর জমিন গাঢ় নীল, সোনালি, রূপোলি আর লাল সুতোয় অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা আঁকা। কোনো নকশা দেখতে নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো, কোনোটা বা নদী বা পাহাড়ের মতো। রিম বিড়বিড় করে বলল, “দাদু কি জ্যামিতির ভক্ত ছিলেন নাকি? কাঁথা আবার স্কয়ার হয় কীভাবে?” সে আরও লক্ষ্য করল, কাঁথাটার ওজনে একটা অদ্ভুত ভারসাম্য আছে, মনে হয় এর সুতোগুলো যেন কোনো বিশেষ চুম্বকীয় শক্তি দিয়ে তৈরি।

সেদিন রাতে হঠ্যৎ হাড়কাঁপানো শীত পড়ল। কলকাতার এ অঞ্চলে শীত সচরাচর অতটা বেশি হয় না, কিন্তু সেদিন মনে হলো  হিমালয় তুষারপাত এদিকেই চলে এসেছে। কোন এক অদৃশ্য কারণে বিছনার পাশেই রিম দাদুর সেই বিশাল কাঁথাটা রেখেছিল। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে রিম দাদুর সেই কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে  শুয়ে পড়ল। শোবামাত্রই সে এক অদ্ভুত আরাম অনুভব করল। ৯ ফিট বাই ৯ ফিট হওয়ার কারণে সে যেদিকেই পাশ ফিরছে, কাঁথাটা তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে রাখছে। কোনো কোণ থেকেই শরীরের এক ইঞ্চিও বাইরে থাকছে না। পা বেরিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাইরে যতই কনকনে ঠান্ডা থাকুক, এই কাঁথার নিচে ঢোকা মাত্রই শরীরটা এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে গেল—আর কাছে মনে হল কেউ একজন পরম আদরে উষ্ণতায় তাকে জড়িয়ে ধরেছে।

সবচেয়ে বড় ম্যাজিকটা ঘটল কিছুক্ষণ পর। রিম লক্ষ্য করল, এই কাঁথাটির একটি বিশেষ গুণ আছে—ঘুমানোর আগে সে যে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে, তার মস্তিষ্কের ভেতরে যেন সেই বিষয়ের একটা পরিষ্কার ছবি তৈরি হচ্ছে। সে ভাবছিল বাবার ঋণের কথা আর কালকের বড় ক্রিকেট ম্যাচের কথা। ভাবতে ভাবতেই সে এক গভীর, স্বপ্নিল ঘুমে তলিয়ে গেল।

স্বপ্নে রিম দেখল সে একটা বিশাল স্টেডিয়ামে বসে আছে। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ভারতের রান। সে স্পষ্ট দেখল, শেষ ওভারে জয়ের জন্য যখন ১২ রান দরকার, তখন অনামী এক তরুণ বোলার পরপর দুটো উইকেট তুলে নিয়ে ভারতকে ম্যাচ জিতিয়ে দিচ্ছে। স্টেডিয়ামের হর্ষধ্বনি তার কানে বেজে উঠল। সে আরও দেখল, পরদিন সকালে শেয়ার বাজারের একটা নির্দিষ্ট গ্রাফ রকেটের মতো ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, ‘তাতান স্টিল’ কোম্পানির লোগোটা বারবার ভেসে উঠল।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই রিমের শরীরটা অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি সতেজ মনে হলো। সে পরীক্ষা করার জন্য তার জমানো অল্প কিছু টাকা দিয়ে ওই ক্রিকেট ম্যাচে অনলাইনে বাজি ধরল এবং শেয়ার বাজারে তাতান স্টিলের স্টকে বিনিয়োগ করল। ফলাফল? হুবহু স্বপ্নের মতো! রিম স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই ৯ ফিট বাই ৯ ফিট কাঁথা আসলে এক ভবিষ্যৎ দর্শন যন্ত্র।

কয়েকদিনের মধ্যেই রিমের এই হঠাৎ পরিবর্তন নজর এড়ালো না তার দুই প্রিয় বন্ধু—বলাই আর শুভেন্দু। এদের মধ্যে বলাই ছিল আদ্যোপান্ত লোভী। সবসময় ফন্দি ফিকির করত কীভাবে কম পরিশ্রমে বড়লোক হওয়া যায়। ধারদেনা করে চলা বলাই রিমের নতুন দামী ফোন আর নিশ্চিন্ত ভাব দেখে হিংসায় জ্বলছিল। অন্যদিকে শুভেন্দু ছিল অত্যন্ত যুক্তিবাদী, প্রতিটি ঘটনার পেছনে বিজ্ঞান আর যুক্তি খুঁজত। বলাই একদিন রিমকে চেপে ধরল, “কিরে রিম, তুই কি লটারি পেয়েছিস? নাকি দাদুর ঘরে কোনো গুপ্তধন ছিল? আমাদের কাছে লুকচ্ছিস কেন?” আমাদের বলনা বিষয়টা কি?

রিম বন্ধুদের ওপর বিশ্বাস করে কাঁথার রহস্যটা জানাল। সে বলল, “দাদুর এই ৯ ফিটের কাঁথাটায় আমি ভবিষ্যৎ  দেখতে পাচ্ছি।”

শুভেন্দু কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইল না। সে বলল, “এটা অবৈজ্ঞানিক। নিশ্চয়ই তুই কোনো অ্যালগরিদম ব্যবহার করছিস। কাঁথা আবার ভবিষ্যৎ দেখায় নাকি!”

বলাই ফিসফিস করে বলল, “রিম, পরের বিশ্বকাপের ফাইনালটা একবার দেখে নে না! আমরা সবাই মিলে বড়লোক হয়ে যাব। শুভেন্দু তোকে নিয়ে গবেষণা করবে।”

রিম বন্ধুদের কথা মেনে নিল, কিন্তু সতর্ক করে দিল, “এটা দাদুর আশীর্বাদ, এটা নিয়ে কোনো নোংরামি করা যাবে না।”

সেই রাতে কাঁথা গায়ে দিয়ে সে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট-এর ফাইনাল আর পরবর্তী এক সপ্তাহের শেয়ার বাজারের ওঠানামা নিয়ে চিন্তা করে ঘুমাল। স্বপ্নে সে দেখল কোন খেলোয়াড় কত রান করবে, আর সোনার দাম কতটা বাড়বে। দাদুর কাঁথার গুণ এতটাই প্রবল যে, স্বপ্নের প্রতিটি ডিটেইল তার মনে গেঁথে রইল। রিমের ভাগ্য বদলাতে শুরু করল, কিন্তু বলাইয়ের মনে লোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। সে ভাবল, এই কাঁথা যদি তার কাছে থাকে, তবে সে হবে দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী লোক।

এক সন্ধ্যায়, বলাই রিমের বাড়িতে এল। সুযোগ বুঝে রিমকে অন্য কাজে ব্যস্ত রেখে, সে আলমারি থেকে দাদুর সেই ৯ ফিটের কাঁথাটা চুপিচুপি হাতিয়ে নিল। কাঁথাটা ব্যাগে ভরে সে প্রায় দৌড়ে বাড়ি ফিরল। তার বুক ধড়ফড় করছিল, কিন্তু চোখে ছিল কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন।

সেদিন রাতে বলাই তার ঘরে দরজা বন্ধ করে দাদুর কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবতে লাগল বিপুল সম্পত্তির কথা, অঢেল টাকার কথা। ভাবতে ভাবতেই সে ঘুমে তলিয়ে গেল।

কিন্তু বলাইয়ের জন্য কাঁথা ভবিষ্যৎ নয়, বয়ে আনল ভয়ঙ্কর বাস্তব। স্বপ্নে সে দেখল, সে একটা অন্ধকার কুয়োর ভেতরে পড়ে যাচ্ছে। চারিদিকে অজস্র কালো হাত তাকে টেনে ধরছে। সে টাকার বদলে দেখল, জ্বলন্ত কয়লা তার দিকে ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। একটা কর্কশ গলা তাকে ডাকছে, “তুই চোর! তোকে পুড়িয়ে মারা হবে!” বলাই ভয়ে চিৎকার করে জেগে উঠল। গা ঘেমে একাকার। কাঁথাটা যেন তার শরীরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে, ছাড়ানো যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে নিজের গায়ের থেকে কাঁথাটা সরিয়ে নেয় সে।

পরের কয়েক রাত বলাইয়ের জন্য নরকবাস হয়ে উঠল। যতবার সে টাকার কথা ভেবে ঘুমায়, ততবারই সে ভয়ঙ্কর দূরস্বপ্ন দেখে। কখনও দেখে সে সাপের কামড়ে মরছে, কখনও দেখে পাওনাদাররা তাকে  জলের ভিতরে চুবিয়ে ধরেছে। সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। প্রচন্ড ভয় পেয়ে প্রতিবারই জেগে উঠতে হচ্ছে তাকে। কাঁথাটা তার কাছে এখন একটা অভিশাপ মনে হলো। সে বুঝতে পারল, এই কাঁথা তার জন্য নয়।

এদিকে রিম কাঁথা খুঁজে না পেয়ে পাগলপ্রায়। সে বুঝতে পারল কে এই কাজ করেছে। শুভেন্দুকে সাথে নিয়ে সে বলাইয়ের বাড়ি গেল। বলাইয়ের চেহারা তখন চেনা যাচ্ছিল না—চোখের নিচে কালি, মুখ ফ্যাকাশে। রিমকে দেখেই বলাই ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁথাটা বের করে রিমের দিকে দিয়ে বলল, “রিম, আমাকে ক্ষমা কর। আমি লোভের বশে এটা নিয়েছিলাম। কিন্তু এই কাঁথা আমাকে বাঁচতে দিচ্ছে না। প্রতি রাতে আমি নরকে নিজেকে আবিষ্কার করছি।”

রিম কাঁথাটা হাতে নিয়ে পরম মমতায় গায়ে বুলাতে লাগল। শুভেন্দু অবাক হয়ে সব দেখছিল। রিম বলল, “বলাই, এই কাঁথার ক্ষমতা তুই উপভোগ করতে পারবি না।”

সে বলাই ও শুভেন্দুকে আসল সত্য জানাল। দাদু অবিনাশ বিশ্বাস মা, অর্থাৎ রিমের বড়দিদা, এই কাঁথাটি নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিদুষী এবং আধ্যাত্মিক নারী। তিনি কাঁথাটি তৈরির সময় প্রতিটি সুতোয় মন্ত্র এবং আশীর্বাদ বুনে দিয়েছিলেন। দাদুকে উপহার দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, “এই কাঁথাটা শুধু তোর গা ঢাকবে না, তোর বংশধরদের পথ দেখাবে। কিন্তু মনে রাখিস, এই কাঁথার ক্ষমতা বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম পর পর জেগে উঠবে।”

অর্থাৎ, অবিনাশ দাদুর পর এই কাঁথার ক্ষমতা রিমের বাবা বিমল বাবুর জীবনে সুপ্ত ছিল। রিম, অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্ম, এই ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। তাই বলাই বা অন্য কেউ এই কাঁথার সুফল পাবে না, বরং লোভের শাস্তি পাবে। দাদুর মা চেয়েছিলেন, বিশ্বাস পরিবার যেন লোভের ফাঁদে না পড়ে, এবং অভাবের সময় এই কাঁথা যেন তাদের রক্ষা করে।

বলাই সব শুনে নিজের ভুলের জন্য লজ্জিত হলো। সে আর কখনও ফাটকা খেলার কথা ভাবল না। রিম কাঁথা নিয়ে বাড়ি ফিরল।

পরের কয়েক মাসে রিমদের ভাগ্য আমূল বদলে গেল। বিমল বাবু একদিন অবাক হয়ে দেখলেন, তার সব ঋণ শোধ হয়ে গেছে। রিম তাকে একটা নতুন কাপড়ের বড় শোরুম খুলে দিল। বাড়িতে নতুন রঙের প্রলেপ পড়ল, মা সুমিত্রা দেবীর রান্নাঘরে এল আধুনিক সব সরঞ্জাম। বিশ্বাস বাড়ির শ্যাওলা ধুয়ে গেল। পাড়ার লোক অবাক হয়ে দেখল, অভাবী রিম এখন এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী তরুণ। বলাইয়ের লোভ দূর হলো, আর শুভেন্দু কাঁথার ক্ষমতাকে ‘জেনেটিক কোড’-এর এক রহস্যময় বহিঃপ্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।

টাকা আসার  সঙ্গে সঙ্গে রিম লক্ষ্য করল তার মানসিক শান্তি কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। কিন্তু সে দাদুর সেই সঙ্কেত ভোলেনি। লোভের পথ পরিহার করে সে বন্ধুদের জানিয়ে দিল, সে আর ক্রিকেট বা শেয়ার বাজার নিয়ে স্বপ্ন দেখবে না। এই কাঁথা সে কেবল বড় কোনো বিপদ বা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।

রিম তার পরিবারকে এক সুন্দর ও সচ্ছল জীবন উপহার দিল। বাবার ব্যবসা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। রিম নিজেও এখন এক সফল যুবক, নিজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সে কোনোদিনই সেই কাঁথাটার কথা ভোলেনি।

বহু বছর পর, রিম যখন নিজেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে, তার চুল পেকে সাদা হয়েছে, তখন সে তার নাতিকে কাছে ডাকল। সে জানত, প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব কিছু লড়াই থাকে। কখনও অভাবের, কখনও বা অস্তিত্বের। রিমের নাতি এখন যে  এই বাড়িতে বড় হচ্ছে, সেখানে অভাবের কোনো ছাপ নেই, কিন্তু তার সামনে হয়তো আসবে অন্য কোনো বড় সংকট। কারণ সে জানে, তার ছেলের জীবনে এই কাঁথা সুপ্ত থাকবে, কিন্তু তার নাতির জীবনে এটি আবার জেগে উঠবে।

রিম দাদুর সেই সেগুন কাঠের আলমারিটা খুলল। ধুলোহীন, সযত্নে রাখা সেই ৯ ফিট বাই ৯ ফিটের নকশি কাঁথাটা বের করল। কাঁথাটা এখনও আগের মতোই উজ্জ্বল আর উষ্ণ, এর জ্যামিতিক নকশাগুলো আজও রহস্যময়। রিম কাঁথাটা আবার ভাঁজ করে আলমারির একদম নিরাপদ তাকে তুলে রাখল। চাবিটা তার নিজের পুরনো ডায়েরির ভেতরে লুকিয়ে রাখল।

সে তার ডায়েরিতে লিখে গেল:

“এই কাঁথা কেবল শীত নিবারণের জন্য নয়, এটি অন্ধকারের পথপ্রদর্শক। যখন তোমাদের চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসবে, যখন যুক্তিতে কোনো সমাধান মিলবে না, তখন এই কাঁথার নিচে আশ্রয় নিও। বড়দিদার আশীর্বাদ এবং দাদুর আত্মা তোমাদের পথ দেখাবে। কিন্তু সাবধান, একে যেন কোনোদিন লোভের হাতিয়ার করো না। এর রহস্য  যেন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাতেই লুকিয়ে থাকে। মনে রেখো, এই ক্ষমতা তোমাদের বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম পর পর জেগে উঠবে—লোভের আগুনের সাথে লড়াই করার শক্তি দিয়ে।”

রিম আলমারির চাবিটা সযত্নে নিজের ড্রয়ারে রেখে দিল। সে জানে, একদিন তার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ অভাবের তাড়নায় বা কোনো বড় সংকটে এই আলমারি খুলবে। আর তখনই ৯ ফিট বাই ৯ ফিটের এই ম্যাজিক আবার জেগে উঠবে, কোনো এক রাতে ভবিষ্যৎ দেখাবে নতুন কোনো উত্তরসূরিকে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

md rezaul hasan

দাদুর কাঁথা ——রাহুল রাজ

Update Time : ০৩:৪২:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

প্রকাশের সময় 27/03/2026

রাহুল রাজ এর ছোট গল্প- দাদুর কাঁথা

বিশ্বাস বাড়ির নোনা ধরা দেওয়াল আর প্রায় রং উঠে যাওয়া ফাটলগুলো দেখে বোঝা যায়, একসময় এখানে লক্ষ্মীর বাস ছিল। কিন্তু সময় আর ভাগ্যের ফেরে এখন সবটা ম্লান। পলেস্তারা খসে পড়া বৈঠকখানাটা যেন নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকে এক হারানো অতীতে।

রিমের বাবা বিমল বাবুর কাঁধে এখন ঋণের পাহাড়, সারাদিন পাওনাদারদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন। মা সুমিত্রা দেবীর কপালে দুশ্চিন্তার স্থায়ী ভাঁজ, উনুনে হাঁড়ি চড়বে কি না, সেই চিন্তায় রাত কাটে। অভাবের এই জরাজীর্ণ সংসারে একমাত্র উজ্জ্বল স্মৃতি ছিলেন রিমের দাদু, অবিনাশ বিশ্বাস।  তিনি ছিলেন এক রহস্যময় জহুরি, শুধু পাথর নয়, মানুষের মনের গভীরে থাকা আসল সোনা চিনতে পারতেন। সবসময় বলতেন, “হাতের রেখায় ভাগ্য থাকে না রে রিম, ভাগ্য থাকে মনের চাদরে। সেই চাদরের বুনিতেই থাকবে তোর আগামী।”

দাদুর মৃত্যুর পর বাড়ির অনেক কিছুই ওলটপালট হয়ে গেল। দাদুর ঘরটা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। অপ্রয়োজনীয় ভেবে কেউ ওমুখো হতো না।

একদিন বৃষ্টির দুপুরে, রিম  কৌতুহল নিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করতে গেল। ঘরে থাকা অন্যান্য আসবাবের সঙ্গে পুরোনো আমলের সেই বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটা চুম্বুকের মতন আকর্ষণ করলো তাকে। ধুলোবালি আর মাকড়সার চালে ঘেরা আলমারিটা খুলে ফেললো রিম। আলমারিটা যেন একটা ছোটখাটো অন্ধকার গুহায় পরিণত হয়েছে। পুরোনো বই আর ন্যাপথলিনের  গন্ধে একাকার হয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধুলোর আস্তরণ সরাতে একদম ওপরের তাক থেকে একটা ভাঁজ করা ভারী কাপড়ের স্তূপ তার হাতে ঠেকল। বের করে আনতেই দেখা গেল এক বিশাল নকশি কাঁথা।

কাঁথাটা মেঝেতে বিছিয়ে রিম অবাক হয়ে গেল। সাধারণত কাঁথা লম্বাটে হয়, কিন্তু এটি নিখুঁত ৯ ফিট বাই ৯ ফিট একটি বর্গাকার কাঁথা। এর জমিন গাঢ় নীল, সোনালি, রূপোলি আর লাল সুতোয় অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা আঁকা। কোনো নকশা দেখতে নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো, কোনোটা বা নদী বা পাহাড়ের মতো। রিম বিড়বিড় করে বলল, “দাদু কি জ্যামিতির ভক্ত ছিলেন নাকি? কাঁথা আবার স্কয়ার হয় কীভাবে?” সে আরও লক্ষ্য করল, কাঁথাটার ওজনে একটা অদ্ভুত ভারসাম্য আছে, মনে হয় এর সুতোগুলো যেন কোনো বিশেষ চুম্বকীয় শক্তি দিয়ে তৈরি।

সেদিন রাতে হঠ্যৎ হাড়কাঁপানো শীত পড়ল। কলকাতার এ অঞ্চলে শীত সচরাচর অতটা বেশি হয় না, কিন্তু সেদিন মনে হলো  হিমালয় তুষারপাত এদিকেই চলে এসেছে। কোন এক অদৃশ্য কারণে বিছনার পাশেই রিম দাদুর সেই বিশাল কাঁথাটা রেখেছিল। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে রিম দাদুর সেই কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে  শুয়ে পড়ল। শোবামাত্রই সে এক অদ্ভুত আরাম অনুভব করল। ৯ ফিট বাই ৯ ফিট হওয়ার কারণে সে যেদিকেই পাশ ফিরছে, কাঁথাটা তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে রাখছে। কোনো কোণ থেকেই শরীরের এক ইঞ্চিও বাইরে থাকছে না। পা বেরিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাইরে যতই কনকনে ঠান্ডা থাকুক, এই কাঁথার নিচে ঢোকা মাত্রই শরীরটা এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে গেল—আর কাছে মনে হল কেউ একজন পরম আদরে উষ্ণতায় তাকে জড়িয়ে ধরেছে।

সবচেয়ে বড় ম্যাজিকটা ঘটল কিছুক্ষণ পর। রিম লক্ষ্য করল, এই কাঁথাটির একটি বিশেষ গুণ আছে—ঘুমানোর আগে সে যে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে, তার মস্তিষ্কের ভেতরে যেন সেই বিষয়ের একটা পরিষ্কার ছবি তৈরি হচ্ছে। সে ভাবছিল বাবার ঋণের কথা আর কালকের বড় ক্রিকেট ম্যাচের কথা। ভাবতে ভাবতেই সে এক গভীর, স্বপ্নিল ঘুমে তলিয়ে গেল।

স্বপ্নে রিম দেখল সে একটা বিশাল স্টেডিয়ামে বসে আছে। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ভারতের রান। সে স্পষ্ট দেখল, শেষ ওভারে জয়ের জন্য যখন ১২ রান দরকার, তখন অনামী এক তরুণ বোলার পরপর দুটো উইকেট তুলে নিয়ে ভারতকে ম্যাচ জিতিয়ে দিচ্ছে। স্টেডিয়ামের হর্ষধ্বনি তার কানে বেজে উঠল। সে আরও দেখল, পরদিন সকালে শেয়ার বাজারের একটা নির্দিষ্ট গ্রাফ রকেটের মতো ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, ‘তাতান স্টিল’ কোম্পানির লোগোটা বারবার ভেসে উঠল।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই রিমের শরীরটা অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি সতেজ মনে হলো। সে পরীক্ষা করার জন্য তার জমানো অল্প কিছু টাকা দিয়ে ওই ক্রিকেট ম্যাচে অনলাইনে বাজি ধরল এবং শেয়ার বাজারে তাতান স্টিলের স্টকে বিনিয়োগ করল। ফলাফল? হুবহু স্বপ্নের মতো! রিম স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই ৯ ফিট বাই ৯ ফিট কাঁথা আসলে এক ভবিষ্যৎ দর্শন যন্ত্র।

কয়েকদিনের মধ্যেই রিমের এই হঠাৎ পরিবর্তন নজর এড়ালো না তার দুই প্রিয় বন্ধু—বলাই আর শুভেন্দু। এদের মধ্যে বলাই ছিল আদ্যোপান্ত লোভী। সবসময় ফন্দি ফিকির করত কীভাবে কম পরিশ্রমে বড়লোক হওয়া যায়। ধারদেনা করে চলা বলাই রিমের নতুন দামী ফোন আর নিশ্চিন্ত ভাব দেখে হিংসায় জ্বলছিল। অন্যদিকে শুভেন্দু ছিল অত্যন্ত যুক্তিবাদী, প্রতিটি ঘটনার পেছনে বিজ্ঞান আর যুক্তি খুঁজত। বলাই একদিন রিমকে চেপে ধরল, “কিরে রিম, তুই কি লটারি পেয়েছিস? নাকি দাদুর ঘরে কোনো গুপ্তধন ছিল? আমাদের কাছে লুকচ্ছিস কেন?” আমাদের বলনা বিষয়টা কি?

রিম বন্ধুদের ওপর বিশ্বাস করে কাঁথার রহস্যটা জানাল। সে বলল, “দাদুর এই ৯ ফিটের কাঁথাটায় আমি ভবিষ্যৎ  দেখতে পাচ্ছি।”

শুভেন্দু কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইল না। সে বলল, “এটা অবৈজ্ঞানিক। নিশ্চয়ই তুই কোনো অ্যালগরিদম ব্যবহার করছিস। কাঁথা আবার ভবিষ্যৎ দেখায় নাকি!”

বলাই ফিসফিস করে বলল, “রিম, পরের বিশ্বকাপের ফাইনালটা একবার দেখে নে না! আমরা সবাই মিলে বড়লোক হয়ে যাব। শুভেন্দু তোকে নিয়ে গবেষণা করবে।”

রিম বন্ধুদের কথা মেনে নিল, কিন্তু সতর্ক করে দিল, “এটা দাদুর আশীর্বাদ, এটা নিয়ে কোনো নোংরামি করা যাবে না।”

সেই রাতে কাঁথা গায়ে দিয়ে সে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট-এর ফাইনাল আর পরবর্তী এক সপ্তাহের শেয়ার বাজারের ওঠানামা নিয়ে চিন্তা করে ঘুমাল। স্বপ্নে সে দেখল কোন খেলোয়াড় কত রান করবে, আর সোনার দাম কতটা বাড়বে। দাদুর কাঁথার গুণ এতটাই প্রবল যে, স্বপ্নের প্রতিটি ডিটেইল তার মনে গেঁথে রইল। রিমের ভাগ্য বদলাতে শুরু করল, কিন্তু বলাইয়ের মনে লোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। সে ভাবল, এই কাঁথা যদি তার কাছে থাকে, তবে সে হবে দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী লোক।

এক সন্ধ্যায়, বলাই রিমের বাড়িতে এল। সুযোগ বুঝে রিমকে অন্য কাজে ব্যস্ত রেখে, সে আলমারি থেকে দাদুর সেই ৯ ফিটের কাঁথাটা চুপিচুপি হাতিয়ে নিল। কাঁথাটা ব্যাগে ভরে সে প্রায় দৌড়ে বাড়ি ফিরল। তার বুক ধড়ফড় করছিল, কিন্তু চোখে ছিল কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন।

সেদিন রাতে বলাই তার ঘরে দরজা বন্ধ করে দাদুর কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবতে লাগল বিপুল সম্পত্তির কথা, অঢেল টাকার কথা। ভাবতে ভাবতেই সে ঘুমে তলিয়ে গেল।

কিন্তু বলাইয়ের জন্য কাঁথা ভবিষ্যৎ নয়, বয়ে আনল ভয়ঙ্কর বাস্তব। স্বপ্নে সে দেখল, সে একটা অন্ধকার কুয়োর ভেতরে পড়ে যাচ্ছে। চারিদিকে অজস্র কালো হাত তাকে টেনে ধরছে। সে টাকার বদলে দেখল, জ্বলন্ত কয়লা তার দিকে ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। একটা কর্কশ গলা তাকে ডাকছে, “তুই চোর! তোকে পুড়িয়ে মারা হবে!” বলাই ভয়ে চিৎকার করে জেগে উঠল। গা ঘেমে একাকার। কাঁথাটা যেন তার শরীরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে, ছাড়ানো যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে নিজের গায়ের থেকে কাঁথাটা সরিয়ে নেয় সে।

পরের কয়েক রাত বলাইয়ের জন্য নরকবাস হয়ে উঠল। যতবার সে টাকার কথা ভেবে ঘুমায়, ততবারই সে ভয়ঙ্কর দূরস্বপ্ন দেখে। কখনও দেখে সে সাপের কামড়ে মরছে, কখনও দেখে পাওনাদাররা তাকে  জলের ভিতরে চুবিয়ে ধরেছে। সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। প্রচন্ড ভয় পেয়ে প্রতিবারই জেগে উঠতে হচ্ছে তাকে। কাঁথাটা তার কাছে এখন একটা অভিশাপ মনে হলো। সে বুঝতে পারল, এই কাঁথা তার জন্য নয়।

এদিকে রিম কাঁথা খুঁজে না পেয়ে পাগলপ্রায়। সে বুঝতে পারল কে এই কাজ করেছে। শুভেন্দুকে সাথে নিয়ে সে বলাইয়ের বাড়ি গেল। বলাইয়ের চেহারা তখন চেনা যাচ্ছিল না—চোখের নিচে কালি, মুখ ফ্যাকাশে। রিমকে দেখেই বলাই ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁথাটা বের করে রিমের দিকে দিয়ে বলল, “রিম, আমাকে ক্ষমা কর। আমি লোভের বশে এটা নিয়েছিলাম। কিন্তু এই কাঁথা আমাকে বাঁচতে দিচ্ছে না। প্রতি রাতে আমি নরকে নিজেকে আবিষ্কার করছি।”

রিম কাঁথাটা হাতে নিয়ে পরম মমতায় গায়ে বুলাতে লাগল। শুভেন্দু অবাক হয়ে সব দেখছিল। রিম বলল, “বলাই, এই কাঁথার ক্ষমতা তুই উপভোগ করতে পারবি না।”

সে বলাই ও শুভেন্দুকে আসল সত্য জানাল। দাদু অবিনাশ বিশ্বাস মা, অর্থাৎ রিমের বড়দিদা, এই কাঁথাটি নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিদুষী এবং আধ্যাত্মিক নারী। তিনি কাঁথাটি তৈরির সময় প্রতিটি সুতোয় মন্ত্র এবং আশীর্বাদ বুনে দিয়েছিলেন। দাদুকে উপহার দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, “এই কাঁথাটা শুধু তোর গা ঢাকবে না, তোর বংশধরদের পথ দেখাবে। কিন্তু মনে রাখিস, এই কাঁথার ক্ষমতা বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম পর পর জেগে উঠবে।”

অর্থাৎ, অবিনাশ দাদুর পর এই কাঁথার ক্ষমতা রিমের বাবা বিমল বাবুর জীবনে সুপ্ত ছিল। রিম, অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্ম, এই ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। তাই বলাই বা অন্য কেউ এই কাঁথার সুফল পাবে না, বরং লোভের শাস্তি পাবে। দাদুর মা চেয়েছিলেন, বিশ্বাস পরিবার যেন লোভের ফাঁদে না পড়ে, এবং অভাবের সময় এই কাঁথা যেন তাদের রক্ষা করে।

বলাই সব শুনে নিজের ভুলের জন্য লজ্জিত হলো। সে আর কখনও ফাটকা খেলার কথা ভাবল না। রিম কাঁথা নিয়ে বাড়ি ফিরল।

পরের কয়েক মাসে রিমদের ভাগ্য আমূল বদলে গেল। বিমল বাবু একদিন অবাক হয়ে দেখলেন, তার সব ঋণ শোধ হয়ে গেছে। রিম তাকে একটা নতুন কাপড়ের বড় শোরুম খুলে দিল। বাড়িতে নতুন রঙের প্রলেপ পড়ল, মা সুমিত্রা দেবীর রান্নাঘরে এল আধুনিক সব সরঞ্জাম। বিশ্বাস বাড়ির শ্যাওলা ধুয়ে গেল। পাড়ার লোক অবাক হয়ে দেখল, অভাবী রিম এখন এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী তরুণ। বলাইয়ের লোভ দূর হলো, আর শুভেন্দু কাঁথার ক্ষমতাকে ‘জেনেটিক কোড’-এর এক রহস্যময় বহিঃপ্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।

টাকা আসার  সঙ্গে সঙ্গে রিম লক্ষ্য করল তার মানসিক শান্তি কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। কিন্তু সে দাদুর সেই সঙ্কেত ভোলেনি। লোভের পথ পরিহার করে সে বন্ধুদের জানিয়ে দিল, সে আর ক্রিকেট বা শেয়ার বাজার নিয়ে স্বপ্ন দেখবে না। এই কাঁথা সে কেবল বড় কোনো বিপদ বা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।

রিম তার পরিবারকে এক সুন্দর ও সচ্ছল জীবন উপহার দিল। বাবার ব্যবসা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। রিম নিজেও এখন এক সফল যুবক, নিজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সে কোনোদিনই সেই কাঁথাটার কথা ভোলেনি।

বহু বছর পর, রিম যখন নিজেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে, তার চুল পেকে সাদা হয়েছে, তখন সে তার নাতিকে কাছে ডাকল। সে জানত, প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব কিছু লড়াই থাকে। কখনও অভাবের, কখনও বা অস্তিত্বের। রিমের নাতি এখন যে  এই বাড়িতে বড় হচ্ছে, সেখানে অভাবের কোনো ছাপ নেই, কিন্তু তার সামনে হয়তো আসবে অন্য কোনো বড় সংকট। কারণ সে জানে, তার ছেলের জীবনে এই কাঁথা সুপ্ত থাকবে, কিন্তু তার নাতির জীবনে এটি আবার জেগে উঠবে।

রিম দাদুর সেই সেগুন কাঠের আলমারিটা খুলল। ধুলোহীন, সযত্নে রাখা সেই ৯ ফিট বাই ৯ ফিটের নকশি কাঁথাটা বের করল। কাঁথাটা এখনও আগের মতোই উজ্জ্বল আর উষ্ণ, এর জ্যামিতিক নকশাগুলো আজও রহস্যময়। রিম কাঁথাটা আবার ভাঁজ করে আলমারির একদম নিরাপদ তাকে তুলে রাখল। চাবিটা তার নিজের পুরনো ডায়েরির ভেতরে লুকিয়ে রাখল।

সে তার ডায়েরিতে লিখে গেল:

“এই কাঁথা কেবল শীত নিবারণের জন্য নয়, এটি অন্ধকারের পথপ্রদর্শক। যখন তোমাদের চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসবে, যখন যুক্তিতে কোনো সমাধান মিলবে না, তখন এই কাঁথার নিচে আশ্রয় নিও। বড়দিদার আশীর্বাদ এবং দাদুর আত্মা তোমাদের পথ দেখাবে। কিন্তু সাবধান, একে যেন কোনোদিন লোভের হাতিয়ার করো না। এর রহস্য  যেন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাতেই লুকিয়ে থাকে। মনে রেখো, এই ক্ষমতা তোমাদের বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম পর পর জেগে উঠবে—লোভের আগুনের সাথে লড়াই করার শক্তি দিয়ে।”

রিম আলমারির চাবিটা সযত্নে নিজের ড্রয়ারে রেখে দিল। সে জানে, একদিন তার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ অভাবের তাড়নায় বা কোনো বড় সংকটে এই আলমারি খুলবে। আর তখনই ৯ ফিট বাই ৯ ফিটের এই ম্যাজিক আবার জেগে উঠবে, কোনো এক রাতে ভবিষ্যৎ দেখাবে নতুন কোনো উত্তরসূরিকে।