Dhaka ০৩:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১২হাজার টাকার হ্যাচারি,কর্মসংস্থান দুই লাখ নারী-পুরুষের

  • সুমন
  • Update Time : ১১:১০:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
  • ৩৯২ Time View

প্রকাশের সময় 10/05/2026

বছরের অর্ধেক সময় পানিতে ডুবে থাকে হাওর। আগাম বন্যা, খরা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের। বর্ষা এলেই কমে যায় কাজের সুযোগ, বাড়ে অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় মদন উপজেলার কুটুরীকোণা গ্রামে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের সনাতনী হ্যাচারিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিকল্প অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা।

একসময় ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন শুধু একটি গ্রামের নয়, পুরো হাওরাঞ্চলের কর্মসংস্থানের অন্যতম ভরসায় পরিণত হয়েছে। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দুই লাখ নারী-পুরুষের।
মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। নদী-খাল-বিল ভরাট, আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতায় কৃষি ও মৎস্য খাতেও বেড়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর বহু মানুষ পাড়ি জমান শহরে।
১৯৯০ সালে কুটুরীকোণা গ্রামের ইদ্রিস মিয়া মাত্র ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে গড়ে তোলেন ‘নাজাহ হাঁসের খামার ও হ্যাচারি’। পরে তাঁর ছেলে আমিনুল ইসলাম সেই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে খামারটিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে।
খামার সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন উৎপাদিত এক দিন বয়সী হাঁসের বাচ্চা ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে। মাস শেষে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হয় খামারটি থেকে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরাসরি ও অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে এসব হাঁসের বাচ্চা।

উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, বাবা খুব ছোট পরিসরে শুরু করেছিলেন। এখন আমরা বড় আকারে কাজ করছি। সঠিক পরিচর্যা করলে এই খাতে ভালো লাভ করা সম্ভব। আমার হিসাবমতে সারা দেশে প্রায় দুই লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

তাঁর সফলতা দেখে গ্রামের আরও অনেক পরিবার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। ফলে বর্ষাকালের কর্মহীন সময়েও স্থানীয় মানুষের আয় হচ্ছে। কমছে শহরমুখী মানুষের চাপ, বাড়ছে গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান।
গ্রামের টিন বা কাঁচা ঘরের ভেতরে তৈরি ছোট ছোট হ্যাচারিতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় ডিম। হ্যারিকেনের আলো ও তুষের তাপে তৈরি করা হয় প্রয়োজনীয় উষ্ণতা। অভিজ্ঞ কারিগরদের তত্ত্বাবধানে ২৭ থেকে ২৮ দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বের হয় বাচ্চা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সনাতনী পদ্ধতিতে উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চার মৃত্যুহার তুলনামূলক কম এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি। এ কারণে বাজারেও এসব বাচ্চার চাহিদা রয়েছে ব্যাপক।
শুধু হ্যাচারির মালিকেরাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ ও সরবরাহ করেও আয় করছেন অনেক মানুষ। ফলে এই উদ্যোগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র।
ক্রেতাদের ভাষ্য, কুটুরীকোণার হাঁসের বাচ্চার মান ভালো হওয়ায় তারা এখান থেকেই কিনতে আগ্রহী।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, কুটুরীকোণা গ্রামে বছরে প্রায় তিন কোটি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হয়। স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই খাত।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ছবিঃ উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

md rezaul hasan

কেন্দুয়ায় দুর্বৃত্তের আগুনে বাক প্রতিবন্ধী নারীর বসতঘর পুড়ে ছাই

১২হাজার টাকার হ্যাচারি,কর্মসংস্থান দুই লাখ নারী-পুরুষের

Update Time : ১১:১০:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

প্রকাশের সময় 10/05/2026

বছরের অর্ধেক সময় পানিতে ডুবে থাকে হাওর। আগাম বন্যা, খরা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের। বর্ষা এলেই কমে যায় কাজের সুযোগ, বাড়ে অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় মদন উপজেলার কুটুরীকোণা গ্রামে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের সনাতনী হ্যাচারিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিকল্প অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা।

একসময় ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন শুধু একটি গ্রামের নয়, পুরো হাওরাঞ্চলের কর্মসংস্থানের অন্যতম ভরসায় পরিণত হয়েছে। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দুই লাখ নারী-পুরুষের।
মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। নদী-খাল-বিল ভরাট, আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতায় কৃষি ও মৎস্য খাতেও বেড়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর বহু মানুষ পাড়ি জমান শহরে।
১৯৯০ সালে কুটুরীকোণা গ্রামের ইদ্রিস মিয়া মাত্র ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে গড়ে তোলেন ‘নাজাহ হাঁসের খামার ও হ্যাচারি’। পরে তাঁর ছেলে আমিনুল ইসলাম সেই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে খামারটিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে।
খামার সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন উৎপাদিত এক দিন বয়সী হাঁসের বাচ্চা ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে। মাস শেষে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হয় খামারটি থেকে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরাসরি ও অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে এসব হাঁসের বাচ্চা।

উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, বাবা খুব ছোট পরিসরে শুরু করেছিলেন। এখন আমরা বড় আকারে কাজ করছি। সঠিক পরিচর্যা করলে এই খাতে ভালো লাভ করা সম্ভব। আমার হিসাবমতে সারা দেশে প্রায় দুই লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

তাঁর সফলতা দেখে গ্রামের আরও অনেক পরিবার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। ফলে বর্ষাকালের কর্মহীন সময়েও স্থানীয় মানুষের আয় হচ্ছে। কমছে শহরমুখী মানুষের চাপ, বাড়ছে গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান।
গ্রামের টিন বা কাঁচা ঘরের ভেতরে তৈরি ছোট ছোট হ্যাচারিতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় ডিম। হ্যারিকেনের আলো ও তুষের তাপে তৈরি করা হয় প্রয়োজনীয় উষ্ণতা। অভিজ্ঞ কারিগরদের তত্ত্বাবধানে ২৭ থেকে ২৮ দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বের হয় বাচ্চা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সনাতনী পদ্ধতিতে উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চার মৃত্যুহার তুলনামূলক কম এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি। এ কারণে বাজারেও এসব বাচ্চার চাহিদা রয়েছে ব্যাপক।
শুধু হ্যাচারির মালিকেরাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ ও সরবরাহ করেও আয় করছেন অনেক মানুষ। ফলে এই উদ্যোগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র।
ক্রেতাদের ভাষ্য, কুটুরীকোণার হাঁসের বাচ্চার মান ভালো হওয়ায় তারা এখান থেকেই কিনতে আগ্রহী।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, কুটুরীকোণা গ্রামে বছরে প্রায় তিন কোটি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হয়। স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই খাত।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ছবিঃ উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম।