Dhaka ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চলে গেলেন অধ্যাপক যতীন সরকার, প্রজ্ঞা ও মননের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

  • সুমন মিয়া
  • Update Time : ০৬:৫১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৫
  • ৬৬২ Time View

প্রকাশের সময় 13/08/2025

নেত্রকোনার কৃতি সন্তান, দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ ও সমাজকর্মী অধ্যাপক যতীন সরকার আর নেই। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বুধবার দুপুর পৌনে তিনটায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

গত কয়েক বছর ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় তিন মাস আগে ঢাকায় তাঁর একটি অস্ত্রোপচার হয়। চলতি মাসের ৮ আগস্ট হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই আজ তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গন, শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিক আন্দোলনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ভক্ত-অনুরাগীরা বলছেন, তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ হারালো এক অনন্য জ্ঞানসাধক ও প্রজ্ঞাবান কণ্ঠস্বর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ নেত্রকোণায় নেওয়া হচ্ছে। পরে রাত ৮টায় নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় শহীদমিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নেত্রকোণা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

অধ্যাপক যতীন সরকার ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে আইএ পাস করে তিনি ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. সম্পন্ন করেন। ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০০২ সালে অবসর নেন।

বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে তিনি প্রবন্ধ, মননচর্চা, গবেষণা ও শিশুতোষ শিক্ষাবিষয়ক রচনায় বিশেষ অবদান রাখেন। তাঁর প্রথম বই “সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা” প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশের কবিগান, বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সংগ্রাম, মানবমন, মানবধর্ম ও সমাজবিপ্লব, গল্পে গল্পে ব্যাকরণ, পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন এবং পাকিস্তানের ভূত-দর্শন।

নিজেকে তিনি পরিচয় দিতেন “কষ্টলেখক” হিসেবে—অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ততার চেয়ে কঠোর পরিশ্রম ও গভীর ভাবনার মাধ্যমে সৃজনশীলতা গড়ে তুলতেন।

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন। বামপন্থী তাত্ত্বিক ও সাম্যবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭৫-৭৬ সালে সরকারি নিপীড়নে প্রায় ১৮ মাস কারাভোগ করেও আন্দোলনের মঞ্চ ছাড়েননি।

অধ্যাপক যতীন সরকার ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন গ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, মনিরুদ্দিন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০২৪ সালে বীরাঙ্গনা সখিনা সিলভার পেন অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন।

মৃত্যুকালে তিনি এক পুত্র সুমন সরকার ও এক কন্যা সুদীপ্তা সরকারসহ অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন। অবসরের পর তিনি নেত্রকোণার সাতপাই এলাকার নিজ বাসভবন ‘বানপ্রস্থ’-এ বসবাস করতেন, যা ছাত্র-সাথীদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

md rezaul hasan

নেত্রকোনায় ইয়াবাসহ স্বামী-স্ত্রী আটক

চলে গেলেন অধ্যাপক যতীন সরকার, প্রজ্ঞা ও মননের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

Update Time : ০৬:৫১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৫

প্রকাশের সময় 13/08/2025

নেত্রকোনার কৃতি সন্তান, দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ ও সমাজকর্মী অধ্যাপক যতীন সরকার আর নেই। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বুধবার দুপুর পৌনে তিনটায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

গত কয়েক বছর ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় তিন মাস আগে ঢাকায় তাঁর একটি অস্ত্রোপচার হয়। চলতি মাসের ৮ আগস্ট হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই আজ তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গন, শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিক আন্দোলনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ভক্ত-অনুরাগীরা বলছেন, তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ হারালো এক অনন্য জ্ঞানসাধক ও প্রজ্ঞাবান কণ্ঠস্বর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ নেত্রকোণায় নেওয়া হচ্ছে। পরে রাত ৮টায় নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় শহীদমিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নেত্রকোণা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

অধ্যাপক যতীন সরকার ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে আইএ পাস করে তিনি ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. সম্পন্ন করেন। ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০০২ সালে অবসর নেন।

বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে তিনি প্রবন্ধ, মননচর্চা, গবেষণা ও শিশুতোষ শিক্ষাবিষয়ক রচনায় বিশেষ অবদান রাখেন। তাঁর প্রথম বই “সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা” প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশের কবিগান, বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সংগ্রাম, মানবমন, মানবধর্ম ও সমাজবিপ্লব, গল্পে গল্পে ব্যাকরণ, পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন এবং পাকিস্তানের ভূত-দর্শন।

নিজেকে তিনি পরিচয় দিতেন “কষ্টলেখক” হিসেবে—অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ততার চেয়ে কঠোর পরিশ্রম ও গভীর ভাবনার মাধ্যমে সৃজনশীলতা গড়ে তুলতেন।

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন। বামপন্থী তাত্ত্বিক ও সাম্যবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭৫-৭৬ সালে সরকারি নিপীড়নে প্রায় ১৮ মাস কারাভোগ করেও আন্দোলনের মঞ্চ ছাড়েননি।

অধ্যাপক যতীন সরকার ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন গ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, মনিরুদ্দিন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০২৪ সালে বীরাঙ্গনা সখিনা সিলভার পেন অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন।

মৃত্যুকালে তিনি এক পুত্র সুমন সরকার ও এক কন্যা সুদীপ্তা সরকারসহ অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন। অবসরের পর তিনি নেত্রকোণার সাতপাই এলাকার নিজ বাসভবন ‘বানপ্রস্থ’-এ বসবাস করতেন, যা ছাত্র-সাথীদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।